Reiad's Library
Book · Review

Tiny Experiments: How to Live Freely in a Hyper-Goal-Oriented World (২০২৫)

বই রিভিউ - নন-ফিকশন: ক্যারিয়ার, মাইন্ডসেট, প্রোডাক্টিভিটি

লেখক: আন-লোর ল্য কানফ (Anne-Laure Le Cunff); 
Ness Labs-এর প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক গুগলার, নিউরোসায়েন্স গবেষক

পুরোটা রিভিউ লেখা হয়েছে বইয়ের গল্প আর ফ্লো ধরে ধরে। বইটা চারটা পর্বে সাজানো; PACT → ACT → REACT → IMPACT; ভেতরে মোট দশটার মতো অধ্যায়। এও ঠিক সেই ক্রমেই এগিয়েছে, যাতে বই পড়ার অনুভূতি কিছুটা পাওয়া যায়।

749096458_27271009215915557_5845451300983140907_n

লেখকের নিজের গল্প

বইটা বোঝার সবচেয়ে ভালো রাস্তা হলো লেখকের জীবনটা আগে জানা, কারণ পুরো বইয়ের "প্রধান চরিত্র" আসলে তিনি নিজেই।

আন-লোর ল্য কানফ একজন ফরাসি নারী, কাজ করতেন গুগলে; ডিজিটাল হেলথ নিয়ে। বাইরে থেকে দেখলে জীবনটা একদম "সেট": নামকরা কোম্পানি, ভালো বেতন, চকচকে ক্যারিয়ার ট্র্যাক, লিংকডইনে ঈর্ষা করার মতো প্রোফাইল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা; প্রতিটা প্রমোশনের পর মনে হতো, "আচ্ছা, এরপর কী? এটার জন্যই কি এত দৌড়ালাম?" আমাদের দেশে যেমন অনেকে বিসিএস বা ব্যাংকের চাকরি পাওয়ার পরেও একটা "তারপর?" অনুভূতিতে ভোগেন; ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম।

তিনি চাকরি ছাড়লেন। একটা স্টার্টআপ শুরু করলেন; সেটা টিকল না। এবার সামনে কোনো ম্যাপ নেই, কোনো পাঁচ বছরের প্ল্যান নেই। তখন তিনি এমন একটা কাজ করলেন যেটা পরে পুরো বইয়ের বীজ হয়ে দাঁড়াল: বিশাল কোনো লক্ষ্য না ঠিক করে, একটা ছোট্ট এক্সপেরিমেন্ট নিলেন; "আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত লিখব, ব্রেন আর প্রোডাক্টিভিটি নিয়ে যা শিখছি তা নিয়ে। দেখি কী হয়।" সফল হতেই হবে এমন কোনো চাপ নেই; শুধু করে দেখা।

সেই ছোট্ট নিউজলেটার থেকে জন্ম নিল Ness Labs; লাখো পাঠকের একটা কমিউনিটি। সেখান থেকে কিংস কলেজ লন্ডনে নিউরোসায়েন্স নিয়ে গবেষণা, আর শেষে এই বই। খেয়াল করুন; এর কোনোটাই কোনো মাস্টারপ্ল্যানের অংশ ছিল না। প্রতিটা ধাপ ছিল একেকটা এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল। বইয়ের মূল দাবিটা তাই লেখকের জীবন দিয়েই প্রমাণিত: বড় প্ল্যান না, ছোট এক্সপেরিমেন্ট।

বইয়ের মূল থিসিস: সিঁড়ি বনাম লুপ

আমরা ছোটবেলা থেকে একটা "লিনিয়ার" বা সরলরৈখিক গল্প শিখে বড় হই: ভালো রেজাল্ট → ভালো ভার্সিটি → ভালো চাকরি → প্রমোশন → বাড়ি-গাড়ি → সুখ। জীবন মানে যেন একটা সিঁড়ি; এক ধাপ শেষ, পরের ধাপ।

ল্য কানফ বলছেন, এই মডেলের তিনটা বড় সমস্যা:

এক, দুনিয়া আর সরলরৈখিক নেই। ইন্ডাস্ট্রি রাতারাতি বদলায়, AI এসে চাকরির ধরন পাল্টে দেয়, আজকের "নিরাপদ" ক্যারিয়ার পাঁচ বছর পর অনিশ্চিত। দশ বছরের প্ল্যান বানানো মানে এমন এক ম্যাপ আঁকা যে রাস্তাটাই প্রতি বছর বদলে যাচ্ছে।

দুই, arrival fallacy; মানে গন্তব্যে পৌঁছানোর ভ্রম। আমরা ভাবি "ওটা পেলেই শান্তি"। পাওয়ার পর দেখা যায় শান্তি দুই সপ্তাহ থাকে, তারপর নতুন একটা গন্তব্য সামনে দাঁড়িয়ে যায়। এটা মনোবিজ্ঞানে বহুবার প্রমাণিত; অর্জনের আনন্দ ব্রেন খুব দ্রুত "স্বাভাবিক" বানিয়ে ফেলে।

তিন, টানেল ভিশন। একটা গোলে চোখ আটকে থাকলে পাশের সুযোগগুলো চোখেই পড়ে না। যে মানুষটা শুধু একটা নির্দিষ্ট চাকরির পেছনে পাঁচ বছর দৌড়াচ্ছে, সে হয়তো খেয়ালই করছে না যে তার একটা সাইড স্কিল এর মধ্যেই আয়ের রাস্তা হয়ে উঠতে পারত।

তাহলে সমাধান কি গোল পুরো বাদ দেওয়া? না। লেখকের প্রস্তাব হলো জীবনের অপারেটিং সিস্টেম বদলানো: উত্তর জানার ভান করা বন্ধ করে বিজ্ঞানীর মতো প্রশ্ন করা শুরু করা; "যদি এটা করে দেখি, কী শিখব?" সিঁড়ির বদলে লুপ: চেষ্টা করো → ফলাফল দেখো → শেখো → আবার চেষ্টা করো। এই লুপটাই বইয়ের চার পর্বের কাঠামো।

পর্ব ১: PACT; মনের পুরনো স্ক্রিপ্ট ভেঙে নতুন প্রতিজ্ঞা

অধ্যায়-ভাবনা ১: যে তিনটা স্ক্রিপ্ট আপনার হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে

বইয়ের শুরুর দিকের সবচেয়ে শক্তিশালী আইডিয়া এটা। লেখক বলছেন, আমরা যখন ভাবি "আমি নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি", আসলে অনেক সময় আমাদের মাথার ভেতরে বসানো তিনটা অটোমেটিক স্ক্রিপ্টের কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে:

সিক্যুয়েল স্ক্রিপ্ট (Sequel script): অতীতের ধারাবাহিকতা। "এতদূর যখন এই লাইনে এসেছি, এটাই চালিয়ে যেতে হবে।" ইকোনমিক্সে অনার্স করেছি, তাই ওই লাইনেই থাকতে হবে; পাঁচ বছর এই চাকরি করেছি, এখন বদলানো মানে পাঁচ বছর জলে। অর্থনীতির ভাষায় এটা sunk cost fallacy; যা খরচ হয়ে গেছে তা ফেরত আসবে না, তবু আমরা সেটার সম্মানে ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখি।

ক্রাউডপ্লিজার স্ক্রিপ্ট (Crowdpleaser script): অন্যের প্রত্যাশা। "লোকে কী বলবে?" বাবা-মা চান সরকারি চাকরি, আত্মীয়রা জিজ্ঞেস করে "বিয়ে কবে, প্রমোশন কবে", ফেসবুক-লিংকডইনে সবার সাফল্য দেখে মনে হয় আমাকেও ওই ছকেই সফল হতে হবে। বাংলাদেশি সমাজে এই স্ক্রিপ্টটা সম্ভবত সবচেয়ে জোরালো; আমাদের অনেক বড় সিদ্ধান্ত আসলে আমাদের না, "সমাজের" নেওয়া।

এপিক স্ক্রিপ্ট (Epic script): মহাকাব্যিক প্যাশনের খোঁজ। "আমার জীবনের একটা মহান উদ্দেশ্য আছে, ওটা খুঁজে পেলেই সব সেট।" শুনতে সুন্দর, কিন্তু এই স্ক্রিপ্টের ফাঁদ হলো; সেই 'এক মহান প্যাশন' খুঁজতে খুঁজতেই জীবন পার হয়ে যায়, আর এর মধ্যে হাতের সামনের আগ্রহগুলোকে "যথেষ্ট বড় না" বলে ফেলে রাখি।

লেখকের পয়েন্ট: এই স্ক্রিপ্টগুলো খারাপ মানুষের লক্ষণ না; এগুলো ব্রেনের অটোপাইলট। সমস্যা একটাই: এগুলো আপনার নিজের লেখা না। তাই প্রথম কাজ হলো নিজের ভেতরে কোন স্ক্রিপ্টটা চলছে সেটা ধরে ফেলা। ধরতে পারলেই তার ক্ষমতা অর্ধেক কমে যায়।

অধ্যায়-ভাবনা ২: নিশ্চয়তার লোভ ছেড়ে কৌতূহল

মানুষের ব্রেন অনিশ্চয়তাকে প্রায় শারীরিক ব্যথার মতো ট্রিট করে; এটা নিউরোসায়েন্সের গবেষণায় দেখা গেছে, আর লেখক যেহেতু নিজেই এই ফিল্ডের গবেষক, বইজুড়ে এমন সায়েন্স-ব্যাকআপ প্রচুর। এজন্যই আমরা "শিওর" রাস্তা খুঁজি: নিশ্চিত চাকরি, নিশ্চিত রুটিন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

কিন্তু কঠিন সত্যটা হলো; নিশ্চয়তা জিনিসটা একটা বিভ্রম। কেউই জানে না পাঁচ বছর পর কী হবে। তাহলে উপায়? লেখক বলছেন: বিজ্ঞানীর মাইন্ডসেট ধার করুন। একজন বিজ্ঞানীর হাইপোথিসিস ভুল প্রমাণ হলে সে কান্নাকাটি করে না; সে বলে, "বাহ, নতুন ডেটা পেলাম।" জীবনের সিদ্ধান্তগুলোকেও যদি চূড়ান্ত রায় না ভেবে হাইপোথিসিস ভাবা যায়; "আমার ধারণা ফ্রিল্যান্সিং আমার জন্য কাজ করবে, পরীক্ষা করে দেখি"; তাহলে ব্যর্থতা বলে আর কিছু থাকে না, থাকে শুধু ফলাফল আর শিক্ষা। ভয়ের জায়গাটা দখল করে নেয় কৌতূহল।

অধ্যায়-ভাবনা ৩: PACT; গোলের বদলে প্রতিজ্ঞা

এটাই বইয়ের কেন্দ্রীয় টুল, বইয়ের নামকরণও এখান থেকে। ফরম্যাটটা মাত্র এক লাইনের:

"আমি [নির্দিষ্ট কাজ] করব [নির্দিষ্ট সময়/সংখ্যক বার] ধরে।"

পার্থক্যটা একটা উদাহরণে পরিষ্কার হবে। SMART goal বলে: "আমি ৩ মাসে ১০ কেজি ওজন কমাব।" খেয়াল করুন; এটা একটা রেজাল্ট, যেটা পুরোপুরি আপনার হাতে নেই (শরীর, জেনেটিক্স, অসুখ, হাজারটা ফ্যাক্টর)। রেজাল্ট না এলে মনে হয় "আমি ব্যর্থ", আর সেই হতাশায় পুরো চেষ্টাটাই বন্ধ হয়ে যায়।

PACT বলে: "আমি ৩০ দিন প্রতিদিন ২০ মিনিট হাঁটব।" এটা একটা অ্যাকশন, যেটা শতভাগ আপনার নিয়ন্ত্রণে। দিন শেষে প্রশ্ন একটাই; করেছি, নাকি করিনি? এখানে ফেল করার কোনো জায়গা নেই। ৩০ দিন শেষে হয় আবিষ্কার করবেন "হাঁটা আমার জীবনে ঢুকে গেছে, ভালো লাগছে", নয়তো শিখবেন "সকালে হাঁটা আমার রুটিনে খাপ খায় না, অন্যভাবে ভাবতে হবে।" দুটোই মূল্যবান ডেটা, দুটোই জয়।

PACT নামটা আসলে চারটা গুণের সংক্ষেপ:

P; Purposeful: কাজটা আপনার সত্যিকার কৌতূহলের সাথে মেলে, লোক-দেখানো না।

A; Actionable: আজই শুরু করা যায়; কোনো পারফেক্ট প্রস্তুতি, দামি কোর্স বা "সঠিক সময়ের" অপেক্ষা লাগে না।

C; Continuous: ছোট আর রিপিটেবল; একবারের বিশাল ঝাঁপ না, বারবার করার মতো ছোট কাজ।

T; Trackable: হ্যাঁ/না দিয়ে মাপা যায়; "চেষ্টা করব" না, "করেছি কি করিনি"।

লেখকের নিজের নিউজলেটারটাও ছিল এমনই এক pact; নির্দিষ্ট কিছুদিন নিয়মিত লেখার প্রতিজ্ঞা। রেজাল্টের গ্যারান্টি ছাড়াই। রেজাল্ট পরে নিজে এসে ধরা দিয়েছে। 🫘

This piece is general education, not investment advice. Rules, rates and fees change: confirm the current details with the relevant institution before acting on anything here.

Comments

    to join in. Everything already here is readable without an account.