শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ কী এবং বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এর অর্থ কী
AAOIFI, DSE, DSES এবং একটি কোম্পানি শরিয়াহসম্মত কি না তা বোঝার সহজ পথ
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে কথা বললে আমরা সাধারণত কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনা করি। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম কত, কোম্পানি কত শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, মুনাফা বাড়ছে কি না, পিই রেশিও কত এবং ভবিষ্যতে শেয়ারের দাম কোথায় যেতে পারে।
কিন্তু একজন মুসলিম বিনিয়োগকারীর জন্য এর পাশাপাশি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।
আমি যে ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করছি, সেই ব্যবসাটি কি শরিয়াহসম্মত?
এই প্রশ্নটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়। এটি একটি বিনিয়োগের কাঠামো বোঝার বিষয়। ইসলামী অর্থব্যবস্থা অর্থ উপার্জনকে নিষিদ্ধ করে না। বরং বৈধ ব্যবসা, সম্পদ সৃষ্টি, অংশীদারিত্ব এবং ঝুঁকি ভাগাভাগিকে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে কিছু ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং কিছু আর্থিক কাঠামো থেকে বিরত থাকতে বলে।
এখানেই আসে শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের ধারণা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে Accounting and Auditing Organization for Islamic Financial Institutions বা AAOIFI একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলাদেশে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য Dhaka Stock Exchange এবং এর Shariah ভিত্তিক সূচক DSES সম্পর্কেও জানা গুরুত্বপূর্ণ।
এই লেখায় আমি চেষ্টা করব পুরো বিষয়টি একেবারে শুরু থেকে ব্যাখ্যা করতে।
এটি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কেনা বা বিক্রির পরামর্শ নয়। বরং একজন বিনিয়োগকারী কীভাবে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ সম্পর্কে চিন্তা করতে পারেন, সেই ভিত্তিটা তৈরি করার চেষ্টা।
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ বলতে কী বোঝায়
সহজ ভাষায় শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ হলো এমন বিনিয়োগ যেখানে বিনিয়োগের বিষয়বস্তু, ব্যবসার কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক বৈশিষ্ট্য ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানে দুটি আলাদা বিষয় মনে রাখা দরকার।
- কোম্পানি কী ব্যবসা করে।
- কোম্পানি কীভাবে সেই ব্যবসা পরিচালনা করে এবং অর্থায়ন করে।
ধরা যাক একটি কোম্পানি বৈধ পণ্য তৈরি করে। শুধু এই কারণে কোম্পানিটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়াহসম্মত ধরে নেওয়া যায় না। কারণ কোম্পানিটির ঋণের কাঠামো, সুদভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে আয়, নগদ অর্থের ব্যবহার এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয়ও বিবেচনায় আসতে পারে।
অর্থাৎ শরিয়াহ স্ক্রিনিং শুধু ব্যবসার নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।
এটি একটি কাঠামোবদ্ধ বিশ্লেষণ।
কেন AAOIFI গুরুত্বপূর্ণ
AAOIFI এর পূর্ণ নাম Accounting and Auditing Organization for Islamic Financial Institutions।
এটি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হিসাব, অডিট, গভর্ন্যান্স, নৈতিকতা এবং শরিয়াহ সম্পর্কিত বিভিন্ন মানদণ্ড ও স্ট্যান্ডার্ড তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একজন সাধারণ শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারীর কাছে AAOIFI এর নাম প্রথমে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু মূল ধারণাটি খুব সহজ।
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় কোনো আর্থিক পণ্য বা বিনিয়োগ কাঠামো গ্রহণযোগ্য কি না তা নির্ধারণ করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা দরকার।
AAOIFI সেই নীতিমালাকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে সাহায্য করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
AAOIFI কোনো শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি বাংলাদেশের কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করে না, কোনো শেয়ারের দাম নির্ধারণ করে না এবং DSE পরিচালনা করে না।
এর কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
AAOIFI ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থার জন্য মানদণ্ড তৈরি করে। আর সেই মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের শরিয়াহভিত্তিক পণ্য, বিনিয়োগ পদ্ধতি এবং স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
ব্যবসার ধরন দিয়ে প্রথম স্ক্রিনিং
শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ ধাপ হলো কোম্পানিটি কী করে তা বোঝা।
একটি কোম্পানি যদি মূল ব্যবসা হিসেবে মদ, জুয়া, প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং, প্রচলিত সুদভিত্তিক বীমা, পর্নোগ্রাফি বা ইসলামী নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে সেই কোম্পানিকে সাধারণত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত ধরা হয় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
কোম্পানির নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
একটি কোম্পানির নাম শুনে সেটিকে ইসলামী মনে হতে পারে। আবার একটি সাধারণ শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম শুনে সেটিকে শরিয়াহসম্মত মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত বিশ্লেষণের জন্য কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন, ব্যবসার বিবরণ এবং আয়ের উৎস দেখতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক একটি কোম্পানি খাদ্যপণ্য তৈরি করে।
প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি বৈধ ব্যবসা মনে হচ্ছে।
কিন্তু কোম্পানিটি যদি একই সঙ্গে এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করে যা শরিয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে পুরো বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
এখানে মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির বাস্তব ব্যবসা বোঝা।
শুধু বৈধ ব্যবসা হলেই কি যথেষ্ট
না।
এটাই শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
একটি কোম্পানির মূল ব্যবসা বৈধ হলেও তার আর্থিক কাঠামো পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কোম্পানির ঋণ কত?
সেই ঋণ কি সুদভিত্তিক?
কোম্পানির হাতে কত নগদ বা সুদভিত্তিক আর্থিক সম্পদ রয়েছে?
কোম্পানি কি এমন কোনো আয় করছে যা শরিয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়?
এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি কোম্পানি বাস্তবে একটি বৈধ পণ্য তৈরি করলেও তার অর্থায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি শরিয়াহসম্মত নাও হতে পারে।
আর্থিক অনুপাতের প্রয়োজন কেন
এখন আসি শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের একটু বেশি প্রযুক্তিগত অংশে।
কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে অনেক ধরনের সংখ্যা থাকে। একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী হয়তো এগুলো দেখে শুধু লাভ এবং সম্পদের পরিমাণ বোঝার চেষ্টা করেন।
কিন্তু শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর মধ্যে ঋণ, সুদভিত্তিক সম্পদ এবং অন্যান্য আর্থিক উপাদানের অনুপাত বিবেচনা করা হতে পারে।
এখানে উদ্দেশ্য হলো একটি কোম্পানির মূল ব্যবসা আসলে কী এবং তার আর্থিক কাঠামোর কতটা অংশ গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রয়েছে তা বোঝা।
একটি কোম্পানির ব্যবসা যদি বৈধ হয় কিন্তু তার আর্থিক কাঠামোতে সুদভিত্তিক ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হয়, তাহলে সেটিকে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করার আগে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
AAOIFI এর আর্থিক স্ক্রিনিং ধারণা
AAOIFI ভিত্তিক শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি আর্থিক অনুপাতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে বিভিন্ন আর্থিক সীমা এবং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো, শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি অনুপাত দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
কারণ কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর কোন সংখ্যা ব্যবহার করা হবে, কোন সময়ের হিসাব নেওয়া হবে এবং কোন পদ্ধতিতে অনুপাত গণনা করা হবে, তার ওপর ফলাফল পরিবর্তিত হতে পারে।
এই কারণে কোনো ওয়েবসাইটে একটি কোম্পানির পাশে শরিয়াহসম্মত লেখা আছে দেখেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিনিয়োগকারীকে পদ্ধতিটি বুঝতে হবে।
বাংলাদেশে DSES কী
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের সঙ্গে পরিচিত হতে গেলে DSES সম্পর্কে জানা দরকার।
DSES হলো Dhaka Stock Exchange Shariah Index।
এটি এমন কোম্পানিগুলোর একটি সূচক যেগুলো নির্দিষ্ট শরিয়াহভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের মানদণ্ড পূরণ করে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ সাধারণ বাজার সূচক এবং শরিয়াহভিত্তিক সূচকের উদ্দেশ্য এক নয়।
DSEX পুরো বাজারের একটি বিস্তৃত চিত্র দিতে পারে।
অন্যদিকে DSES শরিয়াহভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর একটি আলাদা চিত্র তৈরি করে।
তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার।
DSES এ কোনো কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত থাকা মানেই এই নয় যে কোম্পানিটির প্রতিটি কার্যক্রম সম্পর্কে একজন বিনিয়োগকারীর আর কোনো প্রশ্ন করার দরকার নেই।
সূচক একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির ফলাফল।
বিনিয়োগকারীর নিজস্ব গবেষণা তার পরের ধাপ।
DSE এবং শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ের সম্পর্ক
Dhaka Stock Exchange বাংলাদেশের প্রধান শেয়ারবাজার।
এখানে বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে।
একজন বিনিয়োগকারী যদি শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে প্রথমে তাকে বুঝতে হবে যে বাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি একই ধরনের নয়।
কেউ ব্যাংকিং ব্যবসা করে।
কেউ ওষুধ তৈরি করে।
কেউ টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়।
কেউ ভোগ্যপণ্য তৈরি করে।
কেউ শিল্প উৎপাদন করে।
কেউ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাজ করে।
প্রতিটি খাতের ব্যবসায়িক কাঠামো আলাদা।
তাই শরিয়াহ স্ক্রিনিংও একটি কোম্পানির বাস্তব ব্যবসা এবং আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
BSEC এর ভূমিকা কোথায়
এখানে Bangladesh Securities and Exchange Commission বা BSEC এর ভূমিকা বোঝাও জরুরি।
BSEC বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।
এর কাজ হলো বাজারের নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং পুঁজিবাজারের নিয়মকানুন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা।
কিন্তু BSEC এবং শরিয়াহ স্ক্রিনিং একই বিষয় নয়।
BSEC দেখে একটি কোম্পানি বাংলাদেশের প্রচলিত পুঁজিবাজারের নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আছে কি না।
শরিয়াহ স্ক্রিনিং দেখে সেই কোম্পানির ব্যবসা এবং আর্থিক কাঠামো ইসলামী নীতির নির্দিষ্ট মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
একটি কোম্পানি আইনগতভাবে বৈধ এবং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারে, কিন্তু তবুও একজন মুসলিম বিনিয়োগকারীর জন্য শরিয়াহ স্ক্রিনিংয়ে সেটি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
দুটি বিষয় আলাদা।
সুদ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় রিবা বা সুদ একটি মৌলিক নিষিদ্ধ বিষয়।
তাই শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ বিশ্লেষণে সুদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানি কীভাবে অর্থ ধার করে, কোথায় টাকা রাখে এবং কীভাবে অতিরিক্ত অর্থ থেকে আয় করে, এসব বিষয় দেখতে হয়।
তবে বাস্তব কর্পোরেট জগতে বিষয়টি সবসময় একেবারে সরল নয়।
বড় কোম্পানিগুলোর হাতে নগদ থাকে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন লেনদেন হয়।
কোম্পানির আয়ের বিভিন্ন উৎস থাকতে পারে।
তাই একটি কোম্পানিকে বিশ্লেষণ করতে হলে তার আর্থিক বিবরণী বুঝতে হবে।
সামান্য অগ্রহণযোগ্য আয় থাকলে কী হয়
এখানে purification বা আয় পরিশুদ্ধ করার ধারণা আসে।
কিছু শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতিতে এমন পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয় যেখানে একটি কোম্পানির মোট ব্যবসা গ্রহণযোগ্য হলেও সামান্য পরিমাণ অগ্রহণযোগ্য আয় বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক উপাদান রয়েছে।
এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর জন্য purification এর ধারণা প্রযোজ্য হতে পারে।
সহজভাবে বললে, বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ যদি শরিয়াহসম্মত না হয়, তাহলে সেই অংশ নিজের লাভ হিসেবে না রেখে দান করার পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে।
তবে purification এর হিসাব অনুমান করে করা উচিত নয়।
কোন আয় অগ্রহণযোগ্য, কোন অনুপাত ব্যবহার করা হবে এবং কত টাকা পরিশোধন করতে হবে, এগুলো নির্ভরযোগ্য শরিয়াহ নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট স্ক্রিনিং পদ্ধতি অনুসারে নির্ধারণ করা উচিত।
শরিয়াহসম্মত মানেই ঝুঁকিমুক্ত নয়
এটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাগুলোর একটি।
কোনো কোম্পানি শরিয়াহসম্মত হলেই তার শেয়ার নিরাপদ হয়ে যায় না।
শরিয়াহসম্মত এবং ঝুঁকিমুক্ত দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ধারণা।
একটি কোম্পানি শরিয়াহ স্ক্রিনিং পাস করতে পারে কিন্তু তার ব্যবসায়িক ঝুঁকি অনেক বেশি হতে পারে।
তার মুনাফা কমে যেতে পারে।
তার শেয়ারের দাম অনেক কমে যেতে পারে।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা দুর্বল হতে পারে।
শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার বিনিময় হার, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই শরিয়াহ স্ক্রিনিং হলো বিনিয়োগ বিশ্লেষণের একটি স্তর।
এটি পুরো বিনিয়োগ বিশ্লেষণ নয়।
তাহলে একজন বিনিয়োগকারী কী করবেন
আমি একটি সহজ ধারাবাহিক পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেব।
প্রথম ধাপ: ব্যবসাটি বুঝুন
কোম্পানি কী বিক্রি করে?
কীভাবে টাকা আয় করে?
এর প্রধান গ্রাহক কারা?
ব্যবসাটি কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই?
দ্বিতীয় ধাপ: ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্ক্রিন করুন
কোম্পানির কোনো মূল ব্যবসা শরিয়াহর দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ কি না তা দেখুন।
শুধু কোম্পানির নাম নয়।
বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ব্যবসার বিবরণ পড়ুন।
তৃতীয় ধাপ: আর্থিক বিবরণী দেখুন
রাজস্ব কোথা থেকে আসে?
মুনাফা কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
ঋণের পরিমাণ কত?
নগদ ও আর্থিক সম্পদের পরিমাণ কত?
সুদভিত্তিক আয়ের কোনো উল্লেখ আছে কি?
চতুর্থ ধাপ: শরিয়াহ স্ক্রিনিং পদ্ধতি নির্ধারণ করুন
আপনি কোন মানদণ্ড অনুসরণ করছেন তা আগে ঠিক করুন।
AAOIFI ভিত্তিক পদ্ধতি হলে সেই পদ্ধতির নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করুন।
অন্য কোনো স্ক্রিনিং সেবা ব্যবহার করলে তারা কীভাবে হিসাব করে সেটি পড়ুন।
পঞ্চম ধাপ: ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা করুন
আজ একটি কোম্পানি স্ক্রিনিং পাস করেছে বলে আগামী বছরও একই অবস্থায় থাকবে এমন নয়।
কোম্পানির ঋণ পরিবর্তিত হতে পারে।
ব্যবসার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
আয়ের উৎস পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই শরিয়াহ স্ক্রিনিং একবার করে চিরদিনের জন্য রেখে দেওয়ার বিষয় নয়।
কেন বার্ষিক প্রতিবেদন পড়া দরকার
একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রথমে কঠিন মনে হতে পারে।
কিন্তু শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ শুধু শেয়ারের দাম দেখে আপনি জানতে পারবেন না কোম্পানি কীভাবে অর্থ উপার্জন করছে।
দামের চার্ট আপনাকে বাজারের আচরণ দেখায়।
আর্থিক বিবরণী আপনাকে ব্যবসার বাস্তব অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে।
আর শরিয়াহ স্ক্রিনিং সেই ব্যবসার প্রকৃতি এবং আর্থিক কাঠামোকে ইসলামী নীতির আলোকে বিশ্লেষণ করার আরেকটি স্তর যোগ করে।
এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখলে বিনিয়োগের চিত্র অনেক পরিষ্কার হয়।
একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক দুটি কোম্পানি আছে।
প্রথম কোম্পানি খাদ্যপণ্য তৈরি করে।
দ্বিতীয় কোম্পানি একই ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি করে।
দুটির ব্যবসাই প্রথম দৃষ্টিতে বৈধ।
কিন্তু প্রথম কোম্পানির ঋণ খুব বেশি এবং দ্বিতীয় কোম্পানির ঋণ তুলনামূলকভাবে কম।
এখন শুধু ব্যবসার ধরন দেখে দুই কোম্পানিকে একই বলা যাবে না।
আবার শুধু ঋণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াও যথেষ্ট নয়।
কোম্পানির মোট সম্পদ, নগদ, আয়, ঋণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আর্থিক তথ্য একসঙ্গে দেখতে হবে।
এই কারণেই শরিয়াহ স্ক্রিনিং একটি প্রক্রিয়া।
কেন বিভিন্ন তালিকায় ভিন্ন ফল দেখা যায়
আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন, একটি ওয়েবসাইট কোনো কোম্পানিকে শরিয়াহসম্মত দেখাচ্ছে, কিন্তু অন্য একটি তালিকায় সেটি নেই।
এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
একটি স্ক্রিনিং পদ্ধতি অন্যটির চেয়ে ভিন্ন অনুপাত ব্যবহার করতে পারে।
তথ্যের তারিখ আলাদা হতে পারে।
কোন আর্থিক সংখ্যা ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকতে পারে।
এছাড়া শরিয়াহ বোর্ড বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যাতেও পার্থক্য থাকতে পারে।
তাই একজন বিনিয়োগকারীর উচিত শুধু ফলাফল নয়, পদ্ধতিও বোঝা।
শরিয়াহ স্ক্রিনিং কি বিনিয়োগের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়
না।
এটি খুব পরিষ্কারভাবে বলা দরকার।
ধরা যাক একটি কোম্পানি শরিয়াহ স্ক্রিনিং পাস করেছে।
এখনও প্রশ্ন থাকবে।
- কোম্পানির শেয়ার কি অতিরিক্ত দামে লেনদেন করছে?
- ব্যবসার প্রবৃদ্ধি কেমন?
- মুনাফা টেকসই কি না?
- নগদ প্রবাহ কেমন?
- ব্যবস্থাপনা কেমন?
- প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আছে কি?
- শেয়ারের তারল্য কেমন?
- বাজারে কোম্পানিটির মূল্যায়ন যুক্তিসঙ্গত কি না?
এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ শরিয়াহ স্ক্রিনিং হলো একটি দরজা।
দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়।
বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং এবং ইসলামী আর্থিক পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের।
শেয়ারবাজারেও শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের জন্য একটি স্বতন্ত্র ধারণা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্র আরও উন্নত করতে হলে শুধু শরিয়াহসম্মত কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করাই যথেষ্ট হবে না।
বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষাও দরকার।
তাদের জানতে হবে একটি কোম্পানি কীভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়।
বার্ষিক প্রতিবেদন কীভাবে পড়তে হয়।
আর্থিক অনুপাত কীভাবে বুঝতে হয়।
শরিয়াহ স্ক্রিনিং কীভাবে কাজ করে।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় নীতিকে বিনিয়োগের বাস্তব বিশ্লেষণের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করতে হয়।
একজন নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য আমার সহজ কাঠামো
আপনি যদি আজ থেকে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ শেখা শুরু করেন, তাহলে আমি বিষয়টিকে পাঁচটি প্রশ্নে নামিয়ে আনব।
প্রথম প্রশ্ন: কোম্পানিটি কী ব্যবসা করে?
ব্যবসার প্রকৃতি বুঝুন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: ব্যবসার আয়ের উৎস কী?
কোম্পানি কোথা থেকে টাকা আয় করে তা বুঝুন।
তৃতীয় প্রশ্ন: কোম্পানির আর্থিক কাঠামো কেমন?
ঋণ, নগদ, আর্থিক সম্পদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা দেখুন।
চতুর্থ প্রশ্ন: কোন শরিয়াহ স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে?
AAOIFI বা অন্য কোনো পদ্ধতি হলে তার নিয়ম বুঝুন।
পঞ্চম প্রশ্ন: কোম্পানিটি বিনিয়োগ হিসেবে ভালো কি না?
শরিয়াহ স্ক্রিনিং পাস করার পর ব্যবসার মান, মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ করুন।
এই শেষ প্রশ্নটি বাদ দেওয়া যাবে না।
শেষ কথা
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সৌন্দর্য হলো এটি শুধু কোন শেয়ার কেনা যাবে সেই প্রশ্ন করে না।
এটি আরও মৌলিক কিছু প্রশ্ন করতে শেখায়।
আমি যে ব্যবসায় অংশ নিচ্ছি সেটি কী?
কোম্পানি কীভাবে অর্থ উপার্জন করছে?
তার অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে?
আমার বিনিয়োগ থেকে যে আয় আসছে তার প্রকৃতি কী?
এই প্রশ্নগুলো একজন বিনিয়োগকারীকে আরও সচেতন করে।
AAOIFI এর মতো প্রতিষ্ঠান আমাদের একটি কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে। DSE এবং DSES বাংলাদেশের বাজারের বাস্তব প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করে। BSEC আমাদের নিয়ন্ত্রক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দেয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন বিনিয়োগকারীর কাজ হলো নিজের গবেষণা করা।
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ মানে শুধু একটি তালিকা থেকে কোম্পানির নাম খুঁজে নেওয়া নয়।
এটি একটি চিন্তার পদ্ধতি।
ব্যবসা বোঝা।
হিসাব বোঝা।
ঝুঁকি বোঝা।
শরিয়াহর নীতিগুলো বোঝা।
তারপর সবকিছুকে একসঙ্গে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ইসলামী বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা যত বাড়বে, আমার আশা হলো আমরা শুধু কোন শেয়ার হালাল আর কোন শেয়ার হারাম এই সরল প্রশ্নে আটকে থাকব না।
বরং আমরা আরও ভালো প্রশ্ন করব।
- কেন একটি কোম্পানি শরিয়াহসম্মত?
- কোন পদ্ধতিতে সেটি যাচাই করা হয়েছে?
- তার ব্যবসার মান কেমন?
- তার আর্থিক অবস্থা কেমন?
- তার মূল্যায়ন কতটা যুক্তিসঙ্গত?
- এবং একজন মুসলিম বিনিয়োগকারী হিসেবে আমার অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কেন যাচ্ছে?
এই প্রশ্ন করার অভ্যাসই সম্ভবত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুরু।
Comments
to join in. Everything already here is readable without an account.